খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ঘ্যাংরাইল ও তেলিগাতী নদীতে দ্রুত পলি জমে নদী ভরাট হওয়ায় নতুন করে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে ঘ্যাংরাইল নদীর পল্লীশ্রী কলেজ সংলগ্ন কদমতলা খেয়াঘাট এলাকায় শেষ ভাটিতে নদীর করুণ অবস্থা চোখে পড়ছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, নদী রক্ষায় টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর উজানে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে নদী খননের ফলে ডুমুরিয়ার খড়িয়া থেকে বারোআড়িয়া পর্যন্ত তেলিগাতী নদীর প্রায় ২৮ কিলোমিটার অংশে দ্রুত পলি জমে ভরাট হচ্ছে। ভাটার সময় স্রোত না থাকায় জোয়ারের সময় সাগর থেকে আসা পলিতে নদী ভরাট হয়ে পড়ছে।
এ নদী ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রায় ৫০ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। নদী মৃতপ্রায় হয়ে পড়লে একদিকে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষিজীবী মানুষ চরম সংকটে পড়বেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে বিলডাকাতিয়ার মতো শৈলমারী নদীতেও পলি জমে ভরাট হওয়ার কারণে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ৬ থেকে ৭ মাস লক্ষাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ছে। এর প্রভাবে এলাকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি দীর্ঘদিন পানির নিচে থাকায় বোরো চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে।
একই ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে যশোর-খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলের ভবদহ, মনিরামপুর, কেশবপুর, ডুমুরিয়া ও ফুলতলাসহ অন্তত ডজনখানেক উপজেলার ১১৪টি বিল।
সরেজমিনে দেখা গেছে, একসময়ের খরস্রোতা তেলিগাতী নদী এখন অনেক স্থানে এতটাই ভরাট হয়ে গেছে যে দুই পাড়ের মানুষ হেঁটেই নদী পারাপার করছেন। কদমতলা খেয়াঘাট এলাকায় এক মাসের ব্যবধানে নদীতে ১০ ফুটের বেশি পলি জমেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
কদমতলা খেয়াঘাটের পাটনি বিশ্বজিৎ মণ্ডল বলেন, নদীর স্রোত আটকে দেওয়ায় দ্রুত পলি জমছে। এখন জোয়ারের সময় ছাড়া ভাটায় খেয়া চলাচল করতে পারে না। এ সময় অনেকেই হেঁটেই নদী পার হন।
ডুমুরিয়া ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি শাহাজান জমাদ্দার জানান, খর্ডুয়া ব্রিজের দক্ষিণ পাশে বাঁধ দেওয়ার পর থেকেই বাঁধের ভাটিতে দ্রুত পলি জমে নদী ভরাট হচ্ছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, নদী খনন শেষ হওয়ার আগেই ভাটি এলাকার নদী মৃতপ্রায় হয়ে পড়তে পারে, যা বৃহৎ অঞ্চলে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করবে।
মধুগ্রাম বিল কমিটির সভাপতি জি এম আমান উল্লাহ বলেন, প্রবাহমান নদীতে বাঁধ দিয়ে খনন করায় পলি জমে নদী ভরাট হচ্ছে। ভাসমান এক্সকাভেটর বা ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদী খনন করলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। তিনি উজানের নদীগুলো দ্রুত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে সচল রাখার দাবি জানান।
কেন্দ্রীয় পানি কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ আবদুল মোতলেব সরদার বলেন, প্রবাহমান নদী বেঁধে খনন করা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত। এ অঞ্চলের ভবদহ এলাকায় ২৭টি, কেশবপুরে ২৬টি এবং আপার ভদ্রা অববাহিকায় ৩০টি বিল রয়েছে, যা জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে পড়েছে। এছাড়া শৈলমারী অববাহিকায় বিলডাকাতিয়াসহ আরও ৩১টি বিল দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। সব মিলিয়ে এ অঞ্চলে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ লাখ মানুষের বসবাস।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের খুলনার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যশোর পানি উন্নয়ন সার্কেল) বি এম আবদুল মোমিন জানান, খুলনা-যশোর অঞ্চলের ৬টি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার খনন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। ১৪০ কোটি টাকার এই প্রকল্প সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং আগামী জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। প্রয়োজন হলে প্রকল্পের সময় বাড়ানো হবে।
তিনি বলেন, যেখানে বাঁধ দেওয়া হয়েছে তার ভাটিতে প্রায় ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ড্রেজিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে উজানে পানির চাপ বাড়লে বাঁধ কেটে দিয়ে নদীর স্বাভাবিক স্রোত ফিরিয়ে আনা হবে।
এদিকে বিলডাকাতিয়া ও উত্তর ডুমুরিয়া এলাকার পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকার শোলমারী নদী খনন প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। দ্রুত টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে খনন কাজ শুরু করা হবে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। পরিকল্পনা অনুযায়ী রামদিয়া ও শোলমারী মোট ৫টি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প বসানো হবে।
স্থানীয়দের দাবি, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে এবং দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা নিরসনে টিআরএম পদ্ধতি দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হলে যশোর-খুলনা অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ চরম সংকটে পড়বে। নদী বাঁচলে মানুষ বাঁচবে—এমন আহ্বানই জানিয়েছেন এলাকাবাসী।