আজ বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) ১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীনতা যুদ্ধে অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধে প্রথম পাক হানাদারদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে কালীগঞ্জের স্বাধীনতাকামি বীর মুক্তিযোদ্ধারা প্রথম কালিগঞ্জকে পাকহানাদার মুক্তকরে বিজয়ের লাল সবুজ পতাকা তুলেছিল।
আজ এই দিবস টি স্মরণীয় করে রাখতে কালিগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আয়োজনে দিন ব্যাপী নানান কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। দিনের কর্মসূচির মধ্যে আছে সকাল সাড়ে ১০ টায় সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলা পরিষদ মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের মিলন মেলায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন।
বেলা ১১ টায় অতিথিদের মুক্ত আলোচনা। উক্ত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক- ই আজম উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও অসুস্থতার কারণে নাও থাকতে পারেন। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সদস্য এবং ৯ নং সেক্টরের সহ- অধিনায়ক ক্যাপ্টেন (অব:) এম, নুরুল হুদার সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ৯ নং সেক্টরের স্পেশাল ফোর্স কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজ আলম বেগ,
৯ নং সেক্টরের কোম্পানি কমান্ডার মেজর (অব:) মোঃ আহসান উল্লাহ, বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল(অব:) এস ,এম ,এ ,কে আজাদ, সম্মানিত সদস্য ও কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল এবং খুলনা বিভাগীয় মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল্লাহ হিল শাদী, সাতক্ষীরা জেলা মুক্তিযুদ্ধ সংসদ ইউনিটের আহবায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনুজা মন্ডল।
ফিরে দেখা পটভূমি: ১৯৫২ মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ নির্বাচন, ১৯৬২ শিক্ষা আন্দোলন ১৯৬৬ পূর্ব-পাকিস্থানে স্বায়ত্তশাসনের দাবি ১৯৬৮-৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থান , ১৯৭০ এর নির্বাচন এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরাট বিজয়ের পর ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবর রহমানের নির্দেশে শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। এবারের সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম.. এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম… জয় বাংলা!
পদ্ম-মেঘনা-যমুনা তোমার আমার ঠিকানা.. এসব শ্লোগান ছিলো মানুষের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের এ যুদ্ধে সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার সর্বস্তরের মানুষের অংশ গ্রহণ বাংলার ইতিহাসে এক জ্বলন্ত অনির্বান স্বরুপ।
বাংলাদেশের এই স্বাধীনতা আন্দোলনে সশস্ত্র যুদ্ধ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্যে কয়েকটি সেক্টরে দেশকে ভাগ করা হয়েছিল। তারমধ্যে সাতক্ষীরা জেলা ছিল ৮ম ও ৯ম সেক্টরের অধীন। পরবর্তীতে গড়ে ওঠা ৯ নং ৮ নং সেক্টরের সাতক্ষীরার ভোমরা ছিল প্রথম ক্যাম্প।
এখানেই সাতক্ষীরা জেলার মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকে একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল স্থানীয় জনসাধারণ আর তৎকালীন ই.পি.আর ও পুলিশ বাহিনীর সহযোগিতায়। এই সেক্টরের দায়িত্ব প্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডার হলেন- ১। মেজর এম.এ জলিল, ২। মেজর জয়নুল আবেদিন, ৩। আবু ওসমান চৌধুরী, ৪। মেজর এম.এ মনজুর।
এছাড়া সুষ্ঠুভাবে যুদ্ধ পরিচালনার স্বার্থে মুক্তযুদ্ধ চলাকালীন ৯ নং সেক্টরে বেশ কয়েকজন সাব-সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ করা হয়। তারা হলেন- ১। ক্যাপ্টেন শফিকুল্লা, ২। ক্যাপ্টেন মাহবুব আহমেদ, ৩। মোহাম্মদ শাহজাহান (ক্যাপ্টেন শাহজাহান মাস্টার নামে খ্যাত), ৪। ক্যাপ্টেন এম.এন হুদা, ৫। ক্যাপ্টেন জিয়াউদ্দিন, ৬। লে. মাহফুজ আলম বেগ, ৭। লে. সামসুল আরেফিন সেক্টর কমান্ডারদের সাথে সাতক্ষীরা জেলার মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসাবে অনেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আব্দুল গফুর এম এন এ, ক্যাপ্টেন শাহজাহান মাষ্টার, মমতাজউদ্দিন (এম পি), কলারোয়ার শেখ আমানুল্লাহ, স.ম আলাউদ্দিন, এ এফ এম এন্তাজ আলী, সৈয়দ কামাল বখত সাকী (এমপি,), শ্যামনগরের এস, এম ফজলুল হক, কালিগঞ্জের শেখ ওয়াহিদুজ্জামান, বাবর আলী, আতিয়ার রহমান, বরিশালের নূরুল ইসলাম মন্জু,
লুৎফর রহমান, আব্দুল মজিদ, কাজী কামাল ছট্টু, মীর এশরাক আলী, মোস্তাফিজুর রহমান, আজিবর রহমান, কামরুল ইসলাম খান, খায়রুল বাশার, এনামুল হক প্রমুখ (নাম না জানা অসংখ্য মানুষ মুক্তিযুদ্ধের জন্য নিজেদেরকে নিয়োজিত রেখেছিলো তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
১৯৭১ সালের ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতা ও মুক্তির ডাক দিলে সারা বাংলা অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। শান্ত সুশীতল কালিগঞ্জও সেই বিপ্লবে উত্তাল হয়ে ওঠে। সংগ্রামকে সুসংগঠিত করতে তৈরি করা হয়েছিল ২৩ সদস্য বিশিষ্ঠ কালিগঞ্জ সংগ্রাম পরিষদ।
সংগ্রাম পরিষদের সদস্যরা দিন রাতের কর্ম তৎপরতায় মুহুর্তে কালিগঞ্জের রাজনৈতিক চিত্র পাল্টে দেয়। সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে একাত্তরের ৮ মার্চ কালিগঞ্জের ডাকবাংলা চত্বরে পুড়িয়ে ফেলা হয় পাকিস্তানের পতাকা। এ সময় জ্বালাময়ী শ্লোগান দিয়ে লাঠি মিছিলও হয়েছিল কালিগঞ্জ থানা সদরে।
কালিগঞ্জের মানুষ সংঘবদ্ধ হয় এবং মুক্তি বাহিনীর নেতৃত্বে প্রতিরোধ ব্যুহ রচনা করেন। ১০ ও ১১ এপ্রিলের দিকে রটে যায় পাক সেনারা নদী পথে (কাঁকশিয়ালী নদী) হয়ে কালিগঞ্জের দিকে এগিয়ে আসছে। এ খবর শুনে ক্রোধে ও উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দ।
দ্রুত এলাকার সমস্ত বন্দুকধারীদের সংগঠিত করে কালিগঞ্জ বাজার থেকে থানা পর্যন্ত নদীর তীরে গেওয়া বাগানের ঝোঁপের মধ্যে পজিশন নেয় মুক্তি কামি বন্দুকধারীরা। সব বাধা-বিপত্তি ,মায়া কাটিয়ে মে- মাসের মধ্যে শত শত ছেলে দেশ মুক্তির শপথ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে চলে যায়।
কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক সবাই মুক্তিযুদ্ধের জন্য নিজেদের কে উৎসর্গ করে দেশ মাতৃকার সেবায়। যুব সম্প্রদায় ও ছাত্রদের ভূমিকা ছিলো চেখে পড়ার মত তারা মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য খরস্রোতা ইসামতি নদী সাঁতরে মুক্তিযোদ্ধাদের হিঙ্গেলগঞ্জ ক্যাম্পে যোগ দেয়। এদের মধ্যে ক্যাপ্টেন শাহজাহান মাষ্টারের অনুপ্রেরণায় তারালীর শেখ শাহাবুদ্দীন,
আব্দুল খালেক, ইসমাইল, কালিগঞ্জের বারেক, নলতার গোলামসহ অনেক ছাত্ররা ছিলেন তারা নিজেদেরকে দক্ষ যোদ্ধা হিসাবে তৈরী করতে বিহার মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিতে থাকেন।